
“এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ—
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।”
এই চিরায়ত আহ্বান শুধু একটি গান নয়, এটি বাঙালির চেতনার প্রতিধ্বনি। পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয়ের পরপরই ছায়ানট এর শিল্পীরা রমনার বটমূলে সম্মিলিত কণ্ঠে এই গান পরিবেশন করে নতুন বছরকে স্বাগত জানান। এই আয়োজন কেবল সাংস্কৃতিক নয় ; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সামষ্টিক আবেগের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। পুরনো বছরের গ্লানি, ব্যর্থতা ও ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে নতুন আশায় পথচলার যে প্রত্যয়, পহেলা বৈশাখ তারই প্রতীক।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: সময়ের সাথে পঞ্জিকার বিবর্তন
পহেলা বৈশাখের ইতিহাসের শিকড় নিহিত রয়েছে মুঘল আমলে। ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে সম্রাট বাবর ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। সে সময় কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করা হতো হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী, যা চন্দ্রনির্ভর হওয়ায় কৃষি মৌসুমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে কৃষকদের প্রায়ই অসময়ে খাজনা দিতে হতো, যা তাদের জন্য এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করত।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর একটি কার্যকর পঞ্জিকা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তাঁর নির্দেশে প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং হিজরি সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই নতুন সনের গণনা শুরু হয়, যদিও তা কার্যকর ধরা হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় (১৫৫৬) থেকে। প্রথমদিকে এই সনের নাম ছিল “ফসলি সন”, যা কৃষিকাজ ও রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে এটি “বঙ্গাব্দ” নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ধীরে ধীরে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
আধুনিক পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে, ১৯৩৮ সালেও এর চর্চা দেখা যায়। তবে ১৯৬০-এর দশকের পর এটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। ১৯৮৮ সালে বাংলা একাডেমির সুপারিশ অনুযায়ী গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নিয়ম নির্ধারিত হয়। এভাবেই পহেলা বৈশাখ একটি জাতীয় ও সর্বজনীন উৎসবে রূপ নেয়।
রমনার বটমূল
১৩৭২ বঙ্গাব্দ থেকে ছায়ানট রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের যে ধারা শুরু করে, তা আজ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তান আমলে সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে এই আয়োজন ছিল এক প্রতীকী প্রতিবাদ। গান, কবিতা ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে তুলে ধরার এই প্রয়াস পরবর্তীতে জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
বৈশাখী শোভাযাত্রা: প্রতীকের ভাষায় প্রতিবাদ ও উদযাপন
ঢাকার বৈশাখী উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রতিবছর আয়োজন করা হয়। ১৯৮৯ সালে সূচনা হওয়া এই শোভাযাত্রা সময়ের সঙ্গে শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পরিণত হয়েছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক প্রতিবাদ ও সৃজনশীলতার এক শক্তিশালী প্রতীকে। ২০১৬ সালে UNESCO এটিকে ‘Intangible Cultural Heritage’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই আয়োজনের গুরুত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।
পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে তৈরি করেন বিশালাকার মুখোশ, পুতুল, মোটিফ ও প্রতিকৃতি। বাঁশ, কাগজ, কাপড় ও রঙের সৃজনশীল ব্যবহারে নির্মিত এসব শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, প্রকৃতি, প্রাণিজগৎ এবং সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এই প্রস্তুতি শুধু শিল্পচর্চা নয়; এটি এক ধরনের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যেখানে শিক্ষার্থী, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়।
শোভাযাত্রার প্রতিটি উপাদানই প্রতীকধর্মী। বিশালাকার পাখি, বাঘ, ঘোড়া, পেঁচা কিংবা অন্যান্য প্রাণীর প্রতিকৃতি কেবল নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য নয়। এগুলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অন্যায়-অবিচার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের আহ্বান বহন করে। লোকজ শিল্পরীতির মাধ্যমে এই শোভাযাত্রা বাঙালির সংগ্রাম, আশা, স্বপ্ন ও চেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটায়।
এ বছর ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্যে সকাল ৯টায় শোভাযাত্রা শুরু হবে, যার প্রস্তুতি চলবে সকাল ৮টা থেকে। শোভাযাত্রাটি চারুকলার উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলায় ফিরে আসবে।
এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ—মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মোরগ প্রতীকীভাবে জাগরণ ও শক্তির, বেহালা সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির, পায়রা শান্তি ও সম্প্রীতির, হাতি ঐতিহ্য ও গৌরবের এবং ঘোড়া গতিময়তা ও অগ্রগতির প্রতীক। এসব মোটিফের মাধ্যমে একদিকে যেমন লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়, অন্যদিকে সমকালীন সমাজ-বাস্তবতার বার্তাও প্রকাশ পায়।
শোভাযাত্রার আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে প্রায় ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’সহ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবেন। পাশাপাশি প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করবে, যা পুরো আয়োজনকে আরো অর্থবহ করে তুলবে।
বৈশাখী মেলা: লোকজ জীবনের প্রাণস্পন্দন
পহেলা বৈশাখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশাখী মেলা। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই এই মেলার আয়োজন দেখা যায়। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এসব মেলায় বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী, মাটির খেলনা, পিঠা-পুলি, মিষ্টি এবং নানা লোকজ পণ্যের সমাহার থাকে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো লোকজ ক্রীড়া—নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কুস্তি ইত্যাদি। চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে অনুষ্ঠিত ‘জব্বারের বলিখেলা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৈশাখী মেলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
প্রবাসেও বৈশাখী মেলা বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। জাপান, নিউইয়র্ক, লন্ডন, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এই মেলা বাঙালিদের একত্রিত করে এবং তাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সাথে সংযুক্ত রাখে।
প্রাচীন মেলা: বউমেলা ও ঘোড়ামেলার ঐতিহ্য
ঐতিহ্যের ধারায় সোনারগাঁও অঞ্চলে একসময় ‘বউমেলা’র প্রচলন ছিল, যার সূত্রপাত ইশা খান- এর আমলে। এখানে কুমারী, নববধূ ও মায়েরা পূজার মাধ্যমে নিজেদের মনের কামনা প্রকাশ করতেন। সময়ের পরিবর্তনে পশুবলির পরিবর্তে এখন শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা উড়ানো হয়।
একই অঞ্চলে ‘ঘোড়ামেলা’র প্রচলনও ছিল। লোককথা অনুযায়ী, যামিনী সাধন নামে এক ব্যক্তি নববর্ষে ঘোড়ায় চড়ে প্রসাদ বিতরণ করতেন। তাঁর স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই এই মেলার সূচনা। বর্তমানে এখানে নাগরদোলা, চরকা ও নানা বিনোদনমূলক আয়োজন যুক্ত হয়েছে।
বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য
পহেলা বৈশাখ শুধু মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতির উৎসব নয়। এটি দেশের আদিবাসীদের মধ্যেও ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। পার্বত্য অঞ্চলে ‘বৈসাবি’, পাহান, সাঁওতাল ও তুরি সম্প্রদায়ের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান এই উৎসবকে করে তোলে আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের প্রকৃত সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য।
পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসবের দিন নয়। এটি একটি দর্শন। এটি নতুন করে শুরু করার, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং নতুন স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানায়। সামাজিক বিভাজন ভুলে একত্রিত হওয়ার, মানবিকতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ এটি।
এই উৎসব বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
Share it on :
