
২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশের মানুষ নতুন একটি দেশের স্বপ্ন দেখছিল, তখন আমার জন্মজেলা ফেনী মুখোমুখি হয়েছিল এক ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়,, এক নজিরবিহীন বন্যার। আগস্টের শেষ সপ্তাহে আকস্মিকভাবে নেমে আসা এই বিপর্যয় ফেনীর মানুষের দীর্ঘদিনের পরিচিত বন্যার অভিজ্ঞতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমার এলাকার প্রবীণ মানুষদের কাছেও এমন ভয়াবহ বন্যা ছিল অভূতপূর্ব অস্বাভাবিক অষ্টমাশ্চর্য এক অভিজ্ঞতা। যে অঞ্চলে বন্যা বলতে সাধারণত জমির আইল ডুবে যাওয়া কিংবা ফসলের মাঠ প্লাবিত হওয়ার চিত্র পরিচিত ছিল, সেখানে এবার পানির উচ্চতা ও স্রোত মানুষের বসতবাড়ি, জীবিকা ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে বিপন্ন করে তুলেছিল।
সেই সময় আমিও পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে ছিলাম। মাত্র এক রাতের ব্যবধানে পানি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে আমাদের একতলা বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায় আশ্রয় নিতে হয়। পানি উঠে গিয়েছিল দোতলার কাছাকাছি। আমার পরিবারের মানুষদের এমন অসহায়, আতঙ্কিত ও ভয়ার্ত অবস্থায় আগে কখনো দেখিনি। আমাদের ডেইরি ও পোলট্রি খামার ছিল; ফলে বন্যার ক্ষতি আমাদের কাছে শুধু বসতবাড়ি বা সম্পদের ক্ষতি ছিল না,, এটি ছিল পরিবারের জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপরও সরাসরি আঘাত।
বন্যার পর ফেনীর বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, বন্যায় ২৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি ২৩৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি। ৩১৯ কিলোমিটার সড়ক, অন্তত ৬১টি সেতু-কালভার্ট ও ৪৩ কিলোমিটারের বেশি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমির ফসল ও বীজতলা নষ্ট হয়েছে, আর ৬৬ হাজার ৮২৫টি গবাদিপশু ও পোলট্রি মারা গেছে বা ভেসে গেছে। বন্যার পর অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, কাজ হারিয়েছেন, নিঃস্ব হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় প্রকৃত পক্ষে এই পরিসংখ্যানটা আরো কয়েকগুণ বেশী। কিন্তু আর্থিক ক্ষতির এই হিসাবের বাইরেও ছিল অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা,, যাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, আয়ের উৎস হারিয়ে গেছে কিংবা নতুন করে জীবন শুরু করার সামর্থ্যটুকুও অবশিষ্ট ছিল না।
বন্যার এক বছর পর প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদনেও পুনর্বাসনের ঘাটতির চিত্র উঠে আসে। আজকের পত্রিকা-র ২৪ আগস্ট ২০২৫-এর প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ৭১৮টি ঘরের মধ্যে সরকারিভাবে ১১০টি নির্মাণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর পরও বহু বাস্তুচ্যুত পরিবারের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন নিশ্চিত করা যায়নি। এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: দুর্যোগের সময় মানুষকে উদ্ধার করা এবং ত্রাণ দেওয়া জরুরি, কিন্তু দুর্যোগের পর তাদের বসতভিটা, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হচ্ছে?
ফেনীর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আমার আগ্রহ আরও গভীর হয়। আমি বুঝতে শুরু করি, পরিবেশগত বিপর্যয়কে শুধু প্রকৃতির একটি ঘটনা কিংবা সাময়িক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। একটি বন্যা হাজার হাজার মানুষকে বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত করেছে, কর্মচ্যুত করেছে, আবার কেউ দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব করেছে।
সূচনায় এতো বিস্তর ভাবে আজগুবি আলাপ দিচ্ছি এটা বুঝাতে যে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমার আগ্রহের সূচনা কোনো নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক পাঠ কিংবা নীতিগত আলোচনার মধ্য দিয়ে হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ফেনীতে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যার মাধ্যমে নিজের জীবন, পরিবার এবং জন্মস্থানের অভিজ্ঞতা আমাকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে,, বরং বলা ভালো ভাবতে বাধ্য করেছে।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: পরিবেশগত বিপর্যয় বা জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা কি কেবল প্রকৃতির একটি ঘটনা হিসেবে দেখব, নাকি এর সঙ্গে মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্কও বুঝতে চেষ্টা করব?
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নয়, মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, বসবাসের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপরও পড়ে।
এই উপলব্ধি থেকেই পরিবেশ নিয়ে আমার চিন্তা ধীরে ধীরে পরিবেশগত ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফেনীর বন্যা যে পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি করেছিল; পরবর্তী অভিজ্ঞতা ও চর্চা বুঝতে সাহায্য করেছে যে এই বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত সবার জন্য এক নয়। আর সেই অসম অভিঘাত বোঝার মধ্য দিয়েই পরিবেশগত ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তর নিয়ে আলাপের প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে মূলত পরিবেশগত সংকট হিসেবে বিবেচনা করেছি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা কিংবা জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় – এসবের মধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট। এটি শুধু প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে না; উৎপাদনব্যবস্থা, শ্রমের বাজার, মানুষের জীবিকা, সম্পদের বণ্টন এবং উন্নয়নের প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
সম্প্রতি বণিক বার্তার আয়োজনে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক গ্রিন ডায়ালগে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের এই সংকটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নতুন করে ভাবার, জানার ও বোঝাপড়ার সুযোগ হয়েছে। সুযোগটা আমাকে তৈরী করে দেওয়ার জন্য আমার সংগঠন ‘’দ্যা বাংলাদেশ ডায়লগ’’, “KLIMA by TBD”, এবং বণিক বার্তাকে ধন্যবাদ। নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যাংকার, পরিবেশবিদ, পরিবেশবাদী ও উন্নয়ন সহযোগীদের আলোচনায় উঠে এসেছে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সার্কুলার ইকোনমি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতার নানা প্রসঙ্গ। এসব আলোচনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সামনে এসেছে। পরিবেশমন্ত্রী বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের বিষয় নয়, ক্ষতি এখনই দৃশ্যমান। অতিরিক্ত গরমে কারখানার শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কমছে, অনিয়মিত বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হচ্ছে, লবণাক্ততা চাপ দিচ্ছে জমি ও পানীয়জলের ওপর। এই কথাগুলো আগে আমরা শুনতাম পরিবেশকর্মীদের মুখে। এবার শুনলাম অর্থনীতির ভাষায়, মন্ত্রী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মুখে। এটাই এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে আমি মনে করি।
..
পরিবেশ নিয়ে আমার বোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো, পরিবেশগত সংকটকে মানুষের জীবন ও সমাজের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। পরিবেশের অবক্ষয় সবার জীবনকে প্রভাবিত করলেও সবাই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যে কৃষকের জীবিকা বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল, যে শ্রমিককে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে কারখানায় কাজ করতে হয়, যে উপকূলীয় পরিবার লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকটে পড়ে কিংবা যে পরিবার নদীভাঙনে বসতভিটা হারায়,, তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো বিমূর্ত বৈশ্বিক সমস্যা নয়। এটি প্রতিদিনের জীবন ও জীবিকার সংকট।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের বন্যার অভিজ্ঞতা আমার কাছে এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কীভাবে একটি পরিবারের জীবন, সম্পদ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে, তা কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি। এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি শুধু অর্থের অঙ্ক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, সামাজিক অবস্থান এবং পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাও জড়িত।
এ কারণেই পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া পরিবেশগত ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। কারা পরিবেশের ক্ষতির জন্য বেশি দায়ী, কারা সেই ক্ষতির সবচেয়ে বড় শিকার এবং কারা সমাধানের ব্যয় বহন করছে –এই প্রশ্নেগূলোর উত্তর ছাড়া কোনো পরিবেশনীতি পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
…
গ্রিন ডায়ালগে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের অগ্রগতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। হ্যামস গার্মেন্টসের আন্তর্জাতিক LEED সনদে উচ্চ স্কোর অর্জন, শিল্পবর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পাটকাঠি থেকে কাঠের বিকল্প বোর্ড তৈরি, বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার -এসব উদ্যোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রচেষ্টাও প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন একই সঙ্গে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎপাদনব্যবস্থা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমাতে পারে।
তবে, সবুজ কারখানার সংজ্ঞা বা সংখ্যা দিয়ে সবুজ অর্থনীতির সাফল্য পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না। আমাদের দেখতে হবে, উৎপাদনব্যবস্থা কতটা সম্পদ-সাশ্রয়ী, দূষণ কতটা কমছে, শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী কীভাবে উপকৃত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ব্যয়ের দায় কে বহন করছে।
গ্রিন ডায়ালগে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের জ্বালানি সংকট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে এসেছে: বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একদিকে উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত মানদণ্ডের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
সেমিনারে শিল্পোদ্যোক্তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে যে বাংলাদেশের অনেক পরিবেশবান্ধব কারখানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও সব ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাড়তি মূল্য পাওয়া যায় না। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যদি তাদের সরবরাহব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তাহলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ন্যায্য অংশীদারত্বও তাদের বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশকে একদিকে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হবে। কিন্তু এই দায়িত্ব কেবল উৎপাদক দেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনে ঐতিহাসিকভাবে বেশি অবদান রাখা ধনী দেশ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বড় ক্রেতাদেরও তাদের সামর্থ্য ও দায় অনুযায়ী দায়িত্ব নিতে হবে।
একই সঙ্গে শিল্পায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোও সমাধান নয়। প্রশ্নটি শিল্পায়ন হবে কি হবে না, তা নয়; বরং শিল্পায়ন কীভাবে হবে, তার সুফল কারা পাবে এবং পরিবেশগত ক্ষতির দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে।
জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতির আলোচনায় কর্মসংস্থানকে আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি। সেমিনারে কৃষির ওপর বিপুল জনগোষ্ঠীর নির্ভরতা, প্রতিবছর নতুন কর্মপ্রত্যাশীদের শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টো মনে করিয়েছেন, দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল, অথচ জিডিপিতে কৃষির অবদান ১১-১২ শতাংশ। প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ নতুন করে কর্মবাজারে আসছে। কৃষি যান্ত্রিক হলে আরও মানুষ কাজ হারাবে।
অন্যদিকে আরএমজি খাতের একজন বক্তা সতর্ক করেছেন, প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে আছে। তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিনিধি খাতটির কর্মসংস্থান ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং নীতিগত পরিবর্তন শিল্পটির ওপর চাপ তৈরি করছে।
এই বিষয়গুলো জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে; অন্যদিকে যথাযথ পরিকল্পনা না থাকলে কিছু মানুষের প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যেতে পারে বা জীবিকা অনিশ্চিত হতে পারে। তাই সবুজ রূপান্তরের সাফল্য শুধু নিঃসরণ কমানো কিংবা উৎপাদন খরচ হ্রাস দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পরিবর্তনের ব্যয় ন্যায্যভাবে বণ্টনের বিষয়গুলোও যুক্ত করতে হবে।
একইভাবে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগে কৃষক, মৎস্যজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ ন্যায্য রূপান্তরের ধারণা শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনীতির পরিবর্তন এবং জলবায়ুজনিত ক্ষতি উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের জীবিকা ও মর্যাদা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা গড়ে তোলাও এর অংশ।
গ্রিন ডায়ালগের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং এ ক্ষেত্রে নীতিগত সীমাবদ্ধতা। শিল্পোদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি সীমিত অংশ পূরণ করা সম্ভব। অন্যদিকে, কারখানার বাইরে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও মিটারিং ও গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয়ের নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে।
এখানে মূল বিষয়টি শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা নয়; প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সহায়ক নীতিকাঠামো আছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্রিডে সরবরাহ ও অতিরিক্ত বিদ্যুতের সমন্বয়সংক্রান্ত নীতিতে বিনিয়োগের বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি জ্বালানি রূপান্তর, যা একদিকে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও পরিবেশগত ক্ষতি কমাবে। এ জন্য শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন নয়; বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, উপযুক্ত অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হবে।
…
জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক অভিঘাত বুঝতে হলে শুধু জিডিপি, শিল্প উৎপাদন কিংবা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলে চলবে না। দেখতে হবে, এই পরিবর্তনের কারণে কত মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছে, কত মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনরুদ্ধারের সুযোগ কতটা রয়েছে। নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও ঘন ঘন দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ যখন শহরমুখী হয়, তখন তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান, নিরাপদ আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে জলবায়ু সংকটের প্রভাব পরিবেশের সীমানা ছাড়িয়ে শ্রমবাজার, নগর অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলক কম দায়ী, অথচ ক্ষতি সবচেয়ে বেশি সইছে। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিং ফেং ঝাং জানালেন, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসী দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৩৩ লাখে। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত হবে ব্যাপক। আবাসন ও নগরসেবার ওপর চাপ বাড়বে, মানুষের পেশা ও জীবিকা বদলাতে হবে এবং পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
এই প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়নকে কেবল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বা উন্নয়ন সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দায়, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং অভিযোজনের ন্যায্য সুযোগের প্রশ্ন। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অভিযোজন, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, জীবিকা পুনর্গঠন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন জরুরি। সেই অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুদানভিত্তিক হওয়া উচিত, যাতে জলবায়ু সংকটের ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে ঋণের বোঝা আরও না বাড়ে।
ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহীর মনে করালেন, উন্নত দেশগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অর্থাৎ বছরে ৮-৯ বিলিয়ন ডলারের মতো।
এই সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে অস্বস্তি হয়। যে বিপর্যয় মোকাবেলায় এক দেশেই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার পুনর্বিন্যাস দরকার, তার বিপরীতে প্রতিশ্রুত অর্থ কতটা অপ্রতুল, তা বোঝা কঠিন নয়। তাই কপ৩১-এর আগে আমি দুটি কথা বলতে চাই। প্রথমত, বাংলাদেশের দাবি হতে হবে ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজনের অধিকার হিসেবে, দান বা ভিক্ষার আবেদন হিসেবে নয়। দ্বিতীয়ত, এডিবি যেমন বলেছে, দাবির পেছনে থাকতে হবে স্পষ্ট বিনিয়োগ-অগ্রাধিকার ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল। নইলে আমাদের নৈতিক অবস্থান শক্ত হলেও দরকষাকষির টেবিলে তা কাজে আসবে না।
আরেকটি অদৃশ্য অন্যায্যতার কথা তুলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)র ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। সেমিনারে সিপিডির ড. ফাহমিদা খাতুনের উত্থাপিত আরেকটি বিষয়ও এখানে প্রাসঙ্গিক: প্রচলিত অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে পরিবেশগত অবক্ষয় ও জলবায়ুজনিত ক্ষতির পূর্ণ ব্যয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির হিসাব অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে তুলে নাও ধরতে পারে। প্রকৃতির ক্ষয়, মানুষের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি কিংবা জীবিকা হারানোর ব্যয়কে উপেক্ষা করে অর্জিত প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই, সেই প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। অর্থনীতির সাফল্য পরিমাপ করতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি সেই উৎপাদনের পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
এই বাস্তবতায় পরিবেশগত অর্থায়নকে কেবল সবুজ প্রযুক্তি বা অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ হিসেবে দেখলে চলবে না। জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, জীবিকা পুনর্গঠন এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও সহজপ্রাপ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন ও স্বল্পসুদের অর্থায়নের গুরুত্ব এখানেই; যাতে জলবায়ু সংকটের দায় বহন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের ঋণের বোঝা আরও না বাড়ে। একই সঙ্গে এই অর্থায়নের সুফল যেন কেবল বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা সক্ষম বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং ক্ষুদ্র কৃষক, শ্রমিক, নারী, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছেও পৌঁছায়। কারণ জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার সাফল্য শুধু কত অর্থ বিনিয়োগ হলো, তা দিয়ে নয়,, বরং সেই বিনিয়োগ মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনল, তা দিয়েও পরিমাপ করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো অর্থায়ন। জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো, কৃষির রূপান্তর, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন।
গ্রিন ডায়ালগে সহজ শর্তে জলবায়ু অর্থায়ন, পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ এবং ব্যাংকঋণের ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। বিশেষত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে উচ্চ সুদ, জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী হলেও এর প্রভাব বহন করছে অসমভাবে বেশি। ফলে অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নে অনুদান এবং সহজ শর্তের অর্থায়নের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
…..
বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। উপকূলীয় শহরের পানি নিষ্কাশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, সৌরবিদ্যুৎ এবং দুর্যোগ মোকাবেলার অবকাঠামো নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু সহনশীলতাকে কেবল অবকাঠামোর স্থায়িত্ব দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যথেষ্ট নয়।
একটি অঞ্চল বন্যার পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে কি না, তা নির্ভর করে সেখানকার মানুষের আর্থিক সামর্থ্য, বিকল্প জীবিকার সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার সক্ষমতার ওপরও। একইভাবে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু উন্নত বীজ বা সেচপ্রযুক্তি সরবরাহ করলেই হবে না; কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, বাজারে ন্যায্য মূল্য, ঋণের চাপ এবং ফসলহানির ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে।
কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে যদি শ্রমের চাহিদা কমে যায়, তাহলে কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ যখন শহরে আসেন, তখন তাদের জন্য আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ কাজ ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত,, সেটিও সহনশীল অর্থনীতির মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
উন্মুক্ত আলোচনায় এমপি নায়াব ইউসুফ আহমেদের কথাটি আমার সবচেয়ে সোজাসাপ্টা মনে হয়েছে: সবকিছুর মূলে দরকার দৃঢ়তা ও জবাবদিহিতা। আরেক সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়ে বলেছেন, সাফল্য মাপতে হবে গাছ কতটা টিকল তা দিয়ে, কতগুলো লাগানো হলো তা দিয়ে নয়। কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনে করিয়েছেন, নকল লিথিয়াম ব্যাটারি ঠেকানো ও প্যানেল পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা না থাকলে সৌর সেচও ব্যর্থ হবে।
সেমিনারের উন্মুক্ত আলোচনায় নদীভাঙন, বৃক্ষরোপণ এবং সৌর সেচের মতো ভিন্ন ভিন্ন উদাহরণ থেকে একটি সাধারণ শিক্ষা পাওয়া যায়: কোনো কর্মসূচির ঘোষণা এবং তার বাস্তব সাফল্য এক বিষয় নয়। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; নদী ও তীর সংরক্ষণের উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী কতটা সুরক্ষা পাচ্ছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জবাবদিহির আওতায় থাকছে, তা যাচাই করতে হবে।
একই যুক্তি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কতটি গাছ লাগানো হলো, সেটি একটি প্রাথমিক সূচক; কিন্তু কতটি গাছ বেঁচে থাকল, বেড়ে উঠল এবং স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখল, তা না জানলে কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য মূল্যায়ন করা যায় না। আবার সৌর সেচের মতো উদ্যোগে প্রযুক্তি স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়। যন্ত্রপাতির মান, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারির নির্ভরযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত সুফল অর্জিত নাও হতে পারে।
এই উদাহরণগুলো থেকে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নীতির কার্যকারিতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কোনো উদ্যোগের সাফল্য শুধু বরাদ্দকৃত অর্থ, নির্মিত অবকাঠামো বা ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, উদ্যোগটি মানুষের ঝুঁকি কতটা কমিয়েছে, পরিবেশের কী উন্নতি ঘটিয়েছে এবং প্রত্যাশিত জনগোষ্ঠীর কাছে সুবিধা পৌঁছেছে কি না। এ জন্য প্রকল্পের শুরু থেকেই পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, নিয়মিত পরিবীক্ষণ, স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে তাই অর্থায়নের পরিমাণ ও নীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবেশগত ন্যায়বিচার শুধু নীতির ভাষায় প্রতিশ্রুত হলেই প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিষ্ঠিত হয় যখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বাস্তবে সুরক্ষা পায়, সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং দায়িত্বহীনতার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা কার্যকর থাকে।
এ কারণে জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের ধারণাকে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৃষক, শ্রমিক, নারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে শুধু সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
গ্রিন ডায়ালগের জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস শীর্ষক আলোচনা এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলাদেশের জন্য মোটাদাগে কয়েকটি নীতিগত অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা যায়।
প্রথমত, উন্নয়নের সাফল্য পরিমাপের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় কিংবা শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়, দূষণ, স্বাস্থ্যগত ব্যয়, জীবিকার ক্ষতি এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা অর্জিত হচ্ছে, তার পাশাপাশি সেই প্রবৃদ্ধির পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যয় কত, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের জন্য সমন্বিত নীতিকাঠামো প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পানি পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সার্কুলার ইকোনমির উদ্যোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতির অংশ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত মানদণ্ড বাস্তবায়নেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, ন্যায়সংগত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র কৃষক ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী অনুদান, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং উপযুক্ত ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অনুদানভিত্তিক অভিযোজন সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় কার্যকর অর্থায়ন।
চতুর্থত, শিল্পের সবুজ রূপান্তরে শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি মোকাবেলার ব্যবস্থা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের ব্যয় ও দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
পঞ্চমত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। উপকূলীয় সুরক্ষা, নদী পুনরুদ্ধার, নগর উন্নয়ন কিংবা বন সংরক্ষণের কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকা, ভূমির অধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণের নামে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তাদের সম্পদ ও জীবিকা থেকে বঞ্চিত করা হলে সেই সংরক্ষণ ন্যায়সংগত হবে না।
ষষ্ঠত, পরিবেশগত সাফল্যের পরিমাপ ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করতে হবে।
গ্রিন ডায়ালগের আলোচনা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, কৃষি, আর্থিক ব্যবস্থা ও অবকাঠামোকে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের লক্ষ্য শুধু অর্থনীতিকে আরও দক্ষ বা প্রতিযোগিতামূলক করা হতে পারে না। উন্নয়নকে একই সঙ্গে পরিবেশগতভাবে টেকসই, সামাজিকভাবে ন্যায়সংগত এবং অর্থনৈতিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিবেশ সংরক্ষণ উন্নয়নের বিপরীত কোনো ধারণা নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পরিবেশের সুরক্ষা অপরিহার্য। একইভাবে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারই ন্যায়সংগত উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়; সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল ও ব্যয় কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমার কাছে একটি সত্যিকারের সবুজ অর্থনীতির সাফল্য শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো কিংবা পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই সাফল্য নির্ভর করবে আমরা কতটা নিরাপদ পানি, সুস্থ পরিবেশ, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, ন্যায্য জীবিকা এবং দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে পারছি, তার ওপরও।
লেখক পরিচিতি :
মাহির ইবনে ওমর,
এক্সিকিউটিভ , টিবিডি
