
শরতের আকাশের মেঘ, কাশফুলের দোল, শিউলি ঝরার মায়াবী সকাল আর বাতাসে ঢাকের শব্দ সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাংলাদেশে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব। দেবী দুর্গার আগমনে বাংলার প্রকৃতি যেমন নতুন সাজে সেজে ওঠে, তেমনি মানুষের মনেও জাগে আনন্দ, আশা ও নতুন করে বাঁচার প্রত্যয়। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা, আলোকসজ্জায় ঝলমলে রাস্তাঘাট, ধূপের গন্ধ আর আরতির আলোয় তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এই উৎসব হয়ে ওঠে মানুষের মিলনমেলা, সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
এবারও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম, নগর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল সব জায়গাতেই মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতি, পূজার আনুষ্ঠানিকতা এবং উৎসবের নানা আয়োজনে মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবী দুর্গার আরাধনায় মগ্ন হয়েছেন, পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন উৎসবের আনন্দ। অন্য ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণও বহু স্থানে এই উৎসবকে দিয়েছে সার্বজনীনতার রং।
তবে এবারের দুর্গোৎসবের তাৎপর্য শুধু পূজার আয়োজন কিংবা উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন সরকারের শাসনামলে প্রথম দুর্গাপূজা হওয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ কাজ করেছিল। অতীতের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন সময়ের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে জনপরিসরে চলমান আলোচনা থেকে এই উদ্বেগের জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের অভিজ্ঞতা নতুন করে সামনে এনেছে যে একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষ নির্ভয়ে প্রার্থনা করতে পারে, পরিবার নিয়ে মণ্ডপে যেতে পারে এবং কোনো ধরনের হয়রানির আশঙ্কা ছাড়াই আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত প্রথম দুর্গোৎসব ঘিরে তাই প্রত্যাশা ও উদ্বেগ দুইটাই ছিল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকে চেয়েছিলেন, তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা যেন বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়। পূজামণ্ডপে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না আসে এবং উৎসবের আনন্দ যেন ভয় বা অনিশ্চয়তায় ম্লান না হয়।
এবারের উৎসবে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিকভাবে পূজার আয়োজন ও উদযাপন হওয়া অনেকের জন্য স্বস্তির বিষয়। তবে, একবার নির্বিঘ্নে উৎসব উদযাপন করতে পারা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বছরের পর বছর একই নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
বাংলাদেশের পরিচয়ের সঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতার ধারণা গভীরভাবে জড়িত। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা কোনো একটি ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের সমান অধিকার থাকা উচিত।
কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা শুধু বক্তৃতা, স্লোগান কিংবা সংবিধানের পাতায় থাকার মতোন শব্দ হইতে পারেনা কখনোই। এইটার অর্থ প্রকাশ পেতে হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
একটি সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে কোনো হিন্দু পরিবারকে পূজার সময় নিজের বাড়ি বা উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না। কোনো মুসলিম পরিবারকে ঈদ উদযাপনের সময় ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে সংশয়ে থাকতে হবে না। বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও নিজেদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী জীবনযাপনের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর পার্থক্য নাগরিক অধিকারের মাপকাঠি হতে পারে না। সংখ্যায় কম হওয়া কারও অধিকার কমিয়ে দেয় না। বরং একটি রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, তা বোঝা যায় তার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সেই বাস্তবতা দিয়ে।
আমাদের প্রত্যাশা ও অঙ্গীকার হওয়া উচিত বাংলাদেশ এমন একটি সমাজ হয়ে উঠুক, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করবে না, বরং ভিন্নতার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।
তারেক রহমানের সরকারের প্রথম দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপিত হওয়ার অভিজ্ঞতা যদি মানুষের মনে আস্থা তৈরি করে, তবে সেই আস্থাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার দায়িত্ব ও সরকারেরই।
দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকার পূজো মন্ডপ গুলো ঘুরেছেন এবং দেশের তিনটি বিভাগীয় শহরের পুজা মন্ডপে ঘুরেছেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে কুশল বিনিময় করেছেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশজুড়ে। নিজ দলের এমপি ও মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে আনন্দে সামিল হতে। নিঃসন্দেহে সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও এই বিষয়টিকে সুন্দর ভাবেই গ্রহন করেছেন।
তবে রাষ্ট্রের দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে এবং সকল ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে সম্প্রীতি রক্ষায় সক্রিয় হতে হবে। ধর্মীয় উৎসবকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কিংবা বিভাজনের হাতিয়ার না বানিয়ে মানুষের মিলনের উপলক্ষ হিসেবে দেখতে হবে।
এবারের দূর্গাপূজায় একাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে কথা বলেছি। তাদের প্রত্যাশার জায়গাটা শুধু নিরাপদে পূজা উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা, দুর্গোৎসব আবারও বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, নগর ও জনপদে প্রাণের উৎসব হয়ে ফিরে আসুক। আলোকসজ্জায় উজ্জ্বল হয়ে উঠুক শহরের প্রতিটি প্রান্ত,ঢাকের তালে, শঙ্খের ধ্বনিতে এবং মানুষের হাসিতে মুখর হয়ে উঠুক চারপাশ।
দুর্গাপূজার পৌরাণিক তাৎপর্যের কেন্দ্রে রয়েছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়। দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়, অহংকার ও অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের সংগ্রাম চিরন্তন।
আমাদের প্রত্যেকের মনেও রয়েছে নানা অসুর বিদ্বেষ, হিংসা, অহংকার, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য এবং অন্যের প্রতি অবজ্ঞা। এসব প্রবৃত্তি মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি করে, সমাজকে বিভক্ত করে এবং মানবিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে।
দুর্গোৎসবের প্রকৃত শিক্ষা তাই শুধু দেবীর আরাধনায় নয়, নিজের ভেতরের অশুভ প্রবৃত্তিগুলোর বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর মধ্যে নিহিত। অন্য ধর্মের মানুষকে সম্মান করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই সেই শিক্ষা বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যাশা, আগামী বছর যখন আবার শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াবে, কাশফুল দুলবে আর শিউলির সুবাস ছড়িয়ে পড়বে, তখন দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা শুনে কারও মনে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন জাগবে না। বরং সবাই আনন্দের সঙ্গে প্রস্তুতি নেবে, মণ্ডপ সাজাবে, আলোকসজ্জা করবে এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের অপেক্ষায় থাকবে।
সেই বাংলাদেশই আমাদের কাম্য যেখানে দুর্গাপূজার আনন্দে মুসলিম প্রতিবেশীও অংশ নেবেন, ঈদের আনন্দে হিন্দু প্রতিবেশীও শুভেচ্ছা জানাবেন, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উৎসবেও সবাই পাশে দাঁড়াবেন। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ হবে, কিন্তু মানবিক সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে না।
শারদীয় দুর্গোৎসব আবারও ফিরে আসুক এই বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে, প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক নতুন আস্থা।
সর্বোপরি, আমাদের প্রত্যেকের মনের অসুরগুলো বধ হোক। বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভেদের পরিবর্তে সম্প্রীতি এবং ভয়ের পরিবর্তে সাহস প্রতিষ্ঠিত হোক।
About Author:
Abu Hasan Nahian
Executive, The Bangladesh Dialogue
