“পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে” শুধু একজন বাউলশিল্পীর স্বপ্ন নয়; এটি এমন এক পৃথিবীর কল্পনা, যেখানে মানুষকে ধর্ম, জাত, শ্রেণি কিংবা সম্পদের মাপকাঠিতে বিচার করা হবে না। যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে তার মানবিক পরিচয়।
শাহ আব্দুল করীম তার গান, দর্শন ও জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন, যে পৃথিবীর কথা আমাদের বুঝিয়েছেন, সেই পৃথিবী হয়তো এখনও বাস্তব হয়ে ওঠেনি। তবু তার গান ও দর্শনের ভেতর দিয়ে আমরা সেই মানবিক পৃথিবীর একটি সম্ভাবনা দেখতে পাই, যেখানে বিভাজনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষ, আর পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানবতা।
শাহ আবদুল করিমকে শুধু একজন বাউল, লোকশিল্পী বা গীতিকার হিসেবে দেখলে তার শিল্পীসত্তার একটি বড় অংশ আমাদের অদেখাই থেকে যায়। তিনি গান লিখেছেন প্রেম নিয়ে, বিচ্ছেদ নিয়ে, ভাটির জীবন নিয়ে, মানুষের দুঃখ নিয়ে, আবার একই সঙ্গে লিখেছেন সমাজ, বৈষম্য, মানুষের অধিকার ও সময়ের বাস্তবতা নিয়ে। তিনি গান লিখেছেন এবং গেয়েছেন মানুষের জীবন নিয়ে। তার গানে প্রেম যেমন ছিল, তেমনি ছিল ক্ষুধা; আধ্যাত্মিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল প্রতিবাদ; বিরহ যেমন ছিল, তেমনি ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তার গান তাই শুধু শোনার বিষয় নয়; এগুলো এক ধরনের জীবনবোধের প্রকাশ।
১৯১৬ সালে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে শাহ আবদুল করিমের জন্ম। বাবা ইব্রাহিম আলী ছিলেন দরিদ্র কৃষক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তার জীবনে খুব বেশি ছিল না। মাত্র বারো বছর বয়সে গ্রামের একটি নৈশবিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন। পরে নিজের চেষ্টায় জ্ঞান অর্জন করেন। দারিদ্র্য, গ্রামীণ জীবন এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি বেড়ে ওঠাই তার জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে। সেই জীবনই পরে তার গানের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে।

শাহ আবদুল করিমের গান শুনলে প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো, তিনি দূর থেকে মানুষের জীবনকে দেখেননি। তিনি যে জীবন নিয়ে গান করেছেন, সেই জীবন তিনি নিজেই বেঁচেছেন।
ভাটির মানুষের জীবন, কৃষকের জীবন, নদী, মাঠ, হাওর, অভাব, প্রেম, বিচ্ছেদ, উৎসব, দুঃখ – সবকিছু তার গানের মধ্যে জায়গা পেয়েছে। তার হাতে লোকসংগীত কেবল পুরোনো কোনো সাংস্কৃতিক ধারার পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে তার সময়ের মানুষের কথা বলার একটি মাধ্যম। তার জীবনের কথা বলার একটি মাধ্যম।
কৈশোর থেকেই সংগীতের প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়। বাউল ও ভাবসাধনার পরিবেশে তার সংগীতজীবনের শুরু। প্রথম জীবনে তিনি বাউল, ভক্তিমূলক গান, জারি, সারি এবং রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পালাগান গেয়েছেন। পরে তার শিল্পের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। সাধক দুর্বীণ শাহের সঙ্গে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ‘মালজোড়া গান’ পরিবেশন করে পরিচিতি অর্জন করেন। বাউল ও আধ্যাত্মিক গানের সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি মানুষের সামাজিক বাস্তবতাকে তার গানের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
তাকে প্রায়ই ‘বাউলসম্রাট’ বলা হয়। কিন্তু তার শিল্পীসত্তাকে শুধু এই একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার গণচেতনার দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। বাংলাপিডিয়াও উল্লেখ করেছে যে তার গণচেতনার গান এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তাকে কেবল বাউল পরিচয়ে দেখলে তার মূল শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। শাহ আবদুল করিম প্রথম জীবনে উজ্জীবিত হয়েছিলেন বাউলঘরানার গানের পাশাপাশি গণমানুষের শিকড়ে প্রোথিত গান— গণসংগীত দ্বারা। তিনি দেখেছিলেন, সমাজে বৈষম্য আছে। মানুষের মধ্যে বিভাজন আছে। ক্ষমতার কাছে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ অনেক সময় দুর্বল। আর সেই বাস্তবতাকে তিনি গান থেকে বাদ দেননি। দেশের দুর্দশা, ক্ষুধা, সামাজিক বৈষম্য ও মানুষের কষ্ট তার গানের বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তিনি বাউলশিল্পী কামালউদ্দিনের সঙ্গে বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় গণসংগীত পরিবেশন করেন। মানুষের জীবন ও সমাজের বাস্তবতা তার গানে ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। তার কাছে গান ছিল শুধু বিনোদন নয়; মানুষের কাছে পৌঁছানোর, মানুষকে সচেতন করার এবং সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে কথা বলার মাধ্যমও।
এই কারণেই তাঁর গানের জগৎকে শুধু প্রেম ও বাউল দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
তার রচনায় যেমন আছে –
‘জিলমিল জিলমিল করে’,
‘বন্দে মায়া লাগাইছে’,
‘আশি বলে গেল বন্ধু’,
‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু’,
‘গাড়ি চলে না’,
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ;
তেমনি আছে মানুষের দুর্দশা ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে লেখা গান। তিনি মোট ১৬০০-এর বেশি গান রচনা ও সুর করেছেন বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। তাঁর গান বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে- আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে প্রভৃতি। নিগূঢ়তত্ত্ব, ভক্তিগীতি, দেহতত্ত্ব, বিচ্ছেদ, মনঃশিক্ষা, আল্লাহ স্বরণ, নবী স্বরণ, মুর্শিদ স্বরণ, প্রণয়গীতি,জারি, সারি, ভাটিয়ালী, জীবন তত্ব, প্রেম, জাগরনের গান,আঞ্চলিক, ও দেশের গান সহ বাউল জগতের প্রতিটা পর্যায়ে তার গানের ছোঁয়া লেগেছে।
তার গানগুলোর বৈচিত্র্য দেখলে বোঝা যায়, তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা ধারার শিল্পী ছিলেন না। তার কাছে গান ছিল মানুষের সঙ্গে কথা বলার একটি ভাষা। এবং সে ভাষা আলাদা কোন ভাষা নয়, তার নিজেরই ভাষা। তার আত্মশিক্ষা। তিনি কোনো আলাদা মঞ্চ থেকে ‘মানুষের কথা’ বলেননি। তিনি নিজেই সেই মানুষের সমাজ থেকে উঠে এসেছিলেন। ফলে তার গান কোনো দূরের পর্যবেক্ষকের বিবরণ নয়; বরং ভেতর থেকে দেখা জীবনের অভিজ্ঞতা। এই কারণেই তাঁর গানে ভাটি বাংলার জীবন এত স্বাভাবিক ও জীবন্তভাবে উপস্থিত।
তার গানে নদী আছে। নৌকা আছে। মাঠ আছে। কৃষক আছে। প্রেম আছে। বিরহ আছে। আছে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম। আবার একই সঙ্গে আছে আত্মজিজ্ঞাসা, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবতাবোধ।
করীমের গান শুনলে বোঝা যায়, তিনি বাউলধারার আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকে কখনো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তার কাছে মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়া এবং মানুষের বাইরের পৃথিবীকে বদলানোর আকাঙ্ক্ষা দুটি আলাদা বিষয় ছিল না। তার কাছে মানুষের জীবন এবং মানুষের আত্মার অনুসন্ধান দুটিই একই বৃহৎ জীবনের অংশ। এই দুই জগতকে তিনি কখনো আলাদা করেননি।
শাহ আব্দুল করীমের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ এখানেই। তার গান একদিকে ভাটির মাটির গন্ধ বহন করে, অন্যদিকে মানুষের চিরন্তন অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
.
শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ তার প্রেম ও বিচ্ছেদের গান। কিন্তু তার প্রেমের গানও কেবল ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যে আটকে থাকে না। সেখানে গ্রামীণ মানুষের জীবন, সম্পর্ক, অপেক্ষা, হারানোর অনুভূতি, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের সহজ আবেগ একসঙ্গে কাজ করে।
‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু’ কিংবা ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’-এর মতো গান মানুষের খুব পরিচিত অনুভূতিকে সামনে নিয়ে আসে। এই গানগুলো জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে শুধু সুরের আকর্ষণ নয়, মানুষের নিজের জীবনের সঙ্গে এগুলোর সহজ সম্পর্কও কাজ করেছে।
আবার ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এর মতো গানে ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে একটি বৃহত্তর সামাজিক স্মৃতিও তৈরি হয়। এখানে হারিয়ে যাওয়া সময় শুধু একজন মানুষের হারানো সময় নয়; এটি একটি গ্রামীণ সমাজ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
এই জায়গায় শাহ আবদুল করিমের গান ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক হয়ে ওঠে। তার শিল্পের এই সামাজিক চরিত্রই তাকে একজন গণশিল্পী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
..
বাউল ও ভাবসংগীতের ধারায় মানুষ, দেহ, আত্মা, প্রেম ও অস্তিত্বের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। শাহ আবদুল করিম এই ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তার শিল্পের বিশেষত্ব হলো এই আধ্যাত্মিক ও মানবিক ভাবনাকে তিনি বাস্তব জীবনের মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তার কাছে মানুষ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। মানুষ হলো সেই কৃষক, যে মাঠে কাজ করে; সেই শ্রমজীবী, যে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে; সেই প্রেমিক, যে বিচ্ছেদের কষ্ট জানে; সেই গ্রামীণ মানুষ, যে নিজের সময়ের পরিবর্তনকে চোখের সামনে দেখে।
…
শাহ আবদুল করিম যে সময়ের মানুষ ছিলেন, সেই সময় বদলে গেছে। বদলে গেছে গ্রামের জীবন, যোগাযোগব্যবস্থা, বিনোদনের মাধ্যম, সংগীতের বাজার এবং মানুষের জীবনযাপনও। কিন্তু মানুষের কিছু মৌলিক প্রশ্ন বদলায়নি। অভাব এখনও আছে। বৈষম্য এখনও আছে। শ্রমের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন এখনও আছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনও আছে। হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য মানুষের মন খারাপ এখনও হয়। মানুষ এখনও ভালোবাসে, এখনও বিচ্ছিন্ন হয়, এখনও স্বপ্ন দেখে এবং নিজের অস্তিত্বের অর্থ এখনও খোঁজে। আর হয়তো এ কারণেই শাহ আব্দুল করীম আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। এই কারণেই শাহ আবদুল করিমের গান এখনও আমাদের সঙ্গে কথা বলে।
আজকের সময়ে যখন লোকসংগীতকে অনেক সময় শুধু বিনোদন বা নস্টালজিয়ার বা এস্থেটিকিজমের অংশ হিসেবে দেখা হয়, শাহ আবদুল করিম আমাদের মনে করিয়ে দেন লোকসংগীতের ভেতরেও মানুষের ইতিহাস, সমাজ ও চিন্তা সংরক্ষিত থাকে।
শাহ আবদুল করিমের জীবন তাই শুধু একজন বাউলশিল্পীর বাউলসম্রাট হয়ে উঠার জীবন নয়। এটি একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প। একজন শিল্পীর গল্প, যিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, ভাটির মানুষের ভাষা এবং সময়ের বাস্তবতাকে গানে রূপ দিয়েছেন। তিনি বাউল ছিলেন, কিন্তু শুধু বাউল ছিলেন না।
লোকে তাকে এখন বাউলসম্রাট বলে। তিনি গণশিল্পী ছিলেন, কিন্তু শুধু গণশিল্পীও ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে মানুষের গান করে তুলেছিলেন।
শাহ আব্দুল করীমের জীবন মানুষের কথা গাওয়া এক জীবন। ভাটি বাংলার দরিদ্র কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নিপীড়িত মানুষের জীবন, ক্ষুধা, বৈষম্য, প্রেম, বিশ্বাস, প্রতিবাদ- সবকিছুই তার গানের বিষয় হয়ে উঠেছিল। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শাহ আব্দুল করীম চলে যান। কিন্তু তার চলে যাওয়ার সঙ্গে তাঁর পৃথিবী শেষ হয়নি। তাই শাহ আব্দুল করীমের জীবনকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন লোকশিল্পীর প্রয়াণকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন একজন মানুষকে ফিরে দেখা, যিনি গানকে মানুষের কথা বলার একটি ভাষা বানিয়েছিলেন।
সেই ভাষায় আমরাও বলতে চাই-
“পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে”।
সে পৃথিবীতে বাউল হওয়া মানে সবাই গান গাইবে এমন নয়। বরং পৃথিবীটা এমন হবে, যেখানে মানুষ একটু বেশি মানবিক হবে। যেখানে ধর্ম মানুষের মধ্যে দেয়াল তুলবে না। সম্পদ মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করবে না। ক্ষমতা মানুষের কণ্ঠকে চাপা দেবে না। আর মানুষ তার নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলবে না।
পৃথিবীটা একদিন মানুষের হবে। নিশ্চয়ই হবে। হয়তো সেই পৃথিবী এখনও আসেনি। কিন্তু যতদিন মানুষ মানুষকে ভালোবাসার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং বিভাজনের ওপারে একজন মানুষকে আরেকজন মানুষ হিসেবে দেখার স্বপ্ন দেখবে,, ততদিন শাহ আব্দুল করীমের গান আমাদের পথ দেখাবে।
